হৃদয়ের দখিন দুয়ার

Girls Fact News





হৃদয়ের দখিন দুয়ার

পর্ব-১

সুমি আক্তার


সুপ্রীতি শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে গুছিয়ে নিলো। সকালবেলাতেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, যেন কোনো অশুভ কিছু অপেক্ষা করছে। তখনই অর্ণবের মেসেজ—"গাড়িতে এসে বসো।"

সুপ্রীতির বুক ধড়ফড় করে উঠলো। অর্ণবের চোখে আজ সকাল থেকে যে দৃষ্টি, ওর আগে কখনও দেখেনি। এমন দৃষ্টি ভয় ধরায়। অথচ তাদের বিয়ের এক মাসও হয়নি এখনো—আরও দুদিন বাকি।


সুপ্রীতি ফোন করেও কোনো উত্তর পেল না। তীব্র গরমে প্রায় চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর অর্ণব এল এক ঘন্টা পরে। অন্যদিন হলে রাগ করতো সুপ্রীতি। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি অন্যরকম।


অর্ণব ওর দিকে না তাকিয়েই বলল,

—“গাড়িতে উঠো। আর তোমার মাকে বলে দাও, আমরা আজ যাচ্ছি না।”


শরীর ও মনের ভেতর সন্দেহ জমতে লাগলো। অর্ণবের গা ভেজা, চুল থেকে জল ঝরছে, শার্টটা কাঁধে ঝুলছে। সুপ্রীতির বুকের কাঁপন বাড়ে।



---


প্রকৃতি মায়ের কানে বললো,

—“আপু, ভাইয়া আজ আসবে না। রান্নাগুলো ফ্রিজে তুলে রাখো।”


স্বপ্না রান্নাঘরে তখনো ব্যস্ত। বারোটা পদ রান্না করেছেন—পোলাও, মাংস, ভর্তা, পিঠা—সবই সুপ্রীতির পছন্দের। জামাইয়ের মন জেতার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেননি তিনি।


কিন্তু আজকে সব বৃথা। স্বপ্না কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না কেন আসবে না। সেই কবে শুনেছিলেন অর্ণব ডিনারের পর আসবে।


প্রকৃতি হেসে বলল,

—“ডিনার করে এসে কি ডেজার্ট হিসেবে এসব খাবে?”


স্বপ্নার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো। মেয়েকে শক্ত হাতে মানুষ করেছেন, প্রেম ভালোবাসার জায়গা দেননি। ভেবেছিলেন বিয়ের পর মেয়ের সংসার চালনা তিনি-ই করবেন।


কিন্তু অর্ণব! সে তো কারো কথা শোনে না। একবার তো তাঁর বানানো পিঠে দেখে ঠান্ডা গলায় বলেছিল,

—“আমি পিঠে খাই না। এক লক্ষ বার বললেও না। আমি যা না বলি, কেউ তা হ্যাঁ করতে পারে না।”


সেদিন টেবিলে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ। অপমানের সেই তীব্র যন্ত্রণা আজও মনে রেখেছেন স্বপ্না। আজো খাবারগুলো গুছিয়ে রাখলেন, যেন জামাইকে এসব দেখানোই না হয়।



---


নাতাশার জগতে অন্য ঝড়।

ফাহাদের ব্যবহার বদলে গেছে বহুদিন। এখন স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সে নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে। পাঁচ বছরের সংসারে এখন যত অশান্তি—সব যেন কেবল নাতাশার জন্য।


ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কথা শোনানো, রেঁধে দেওয়া খাবার না খেয়ে বাইরে থেকে অর্ডার করে খাওয়া—সব মিলিয়ে নাতাশার ধৈর্য চূড়ান্ত পর্যায়ে।


শাশুড়ি আজও বকাবকি করলেন,

—“বিয়ে বাড়িতে বসে থাকলে হবে? ঝিলিকের জন্য পাঠানো জিনিস গোছাও!”


নাতাশা মুখে কিছু বললো না। রান্নাঘরে গিয়ে ডাল চড়িয়ে দিলো। মাংস, সবজি আগে থেকে কাটা ছিল। একদিকে কাজ সামলানো, অন্যদিকে নিজের ভাঙা মন—সবই একসাথে চলছে।


ঝিলিক, ওর ছোট ননদ, বিয়েতে ভীষণ খুশি। অথচ নাতাশা জানে ওর বরের মন অন্য কোথাও। সেই ‘অন্যজন’ দুর্ভাগ্যজনকভাবে নাতাশার নিজের বোন।


ঝিলিকের রুমে ঐশী বলছিল,

—“তোর খারাপ লাগছে না? ইশরাক ভাই তো অন্যজনকে ভালোবাসে।”

ঝিলিক নির্বিকার মুখে জবাব দিলো,

—“তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”


একসময় ইশরাক নাতাশাকে ফোন করলো,

—“ভাবী, একবার যোগাযোগটা করিয়ে দাও প্লিজ!”

নাতাশা ধীরে উত্তর দিলো,

—“না ভাই।”



---


অর্ণব এখন দুদিন ধরে সুপ্রীতির সঙ্গে কথা বলছে না। আজ সে বাসায় ফিরেছে হাত ব্যান্ডেজ করা অবস্থায়।

সুপ্রীতি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

—“কি হয়েছে তোমার?”

—“নাদিম শুয়োরটাকে মারতে গিয়ে হাত কেটে গেছে।”


সুপ্রীতির চোখ ছানাবড়া। নাদিম তো অর্ণবের স্কুলবন্ধু! তবে কি সেদিন পার্টিতে যা ঘটেছিল তার প্রতিশোধই এটা?


সেদিনের ঘটনায় সুপ্রীতির লজ্জা মিশ্রিত রাগ আজও জেগে আছে। আর অর্ণব তখন বলেছিল,

—“তুমি নিচে যাও। আমি একটু পরে আসছি।”


কিন্তু পরে অর্ণবের চোখে ছিল আগুন। সারা রাত শাওয়ারে ভিজেছে, এমনকি একসময় সুপ্রীতিকে টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে বলেছিল,

—“তুমি কি ওর কথা উপভোগ করেছ?”


সুপ্রীতি তীব্রভাবে প্রতিবাদ করেছিল,

—“আমার কী উচিৎ উপভোগ করা?”


অর্ণব বলেছিল,

—“তাহলে আমাকে কেন থামালে? আমি ওকে শেষ করে দিতাম।”


সেই রাতে সুপ্রীতির মনে হয়েছিল, অর্ণবকে সে হয়তো এখনো চেনেই না।



---


বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুপ্রীতি প্রকৃতির মেসেজ পড়ে।

—“আপু, ঠিক আছো? ভাইয়ার সঙ্গে কিছু হয়েছে?”


সুপ্রীতি ভাবছে কী লিখবে। কেউ একজন যদি তাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তবে কি তারও উচিৎ সবকিছু উজাড় করে ভালোবেসে দেওয়া?


Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.