মির্জা বাড়ির রহস্য | তৃতীয় পর্ব

Girls Fact News

মির্জা বাড়ির রহস্য | তৃতীয় পর্ব
(ঘটনা – ২০১৮, চরভদ্রাসন, ফরিদপুর)

আরিফের মুখ থেকে ভয়ার্ত আর্তনাদ ভেসে উঠতেই মির্জা বাড়ির বাতাস থমকে যায়। পাশের ঘরে থাকা মা সালেহা বেগম দ্রুত ছুটে আসেন।
"আরিফ! কি হয়েছে বাবা? এমন চিৎকার করছিস কেনো?"
বিছানার এক পাশে ছিটকে পড়া আরিফ তখন অজ্ঞান। কপালে ঘাম, ঠোঁট কেঁপে উঠছে। ঈশিতা তখন ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে, হাতে ছুরি নেই, চোখে জল।
"আমি কিছু করিনি মা, ও হয়তো খারাপ স্বপ্ন দেখেছে" – ভাঙা গলায় বলে ঈশিতা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হারুন সাহেব ও বাড়ির অন্যরা জড়ো হয় ঘরের মধ্যে। সবার চোখেই প্রশ্ন – কী হয়েছে?

আরিফ ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পায়। চোখ মেলে দেখে আশপাশে সবাই। মা তার মাথায় পানি দিচ্ছে, বাবা তাকিয়ে আছেন চিন্তিত মুখে।

"আমি... আমি সিয়াম ভাইকে দেখেছি... উনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন... গলা কাটা, মুখে কাদা... ঈশিতা ভাবি... উনি..."
আরিফ জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলতে থাকে। কিন্তু কারো মুখেই বিশ্বাস নেই। সবাই ভাবে ওর হয়তো মানসিক সমস্যা হয়েছে।

ঈশিতা কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আমি বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। আরিফ কেনো এমন বলছে? আমি তো ওকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখতাম।"
সবাই ঈশিতার কথা শুনে নিশ্চিন্ত হয়, কিন্তু আরিফ বুঝতে পারে—এই মেয়েটা যা দেখায়, তা আসল নয়। তার মুখের পিছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার, অজানা কিছু।


---

পরদিন রাত –

আরিফ সিদ্ধান্ত নেয়, সত্য জানতে হবে। সিয়ামের ডায়রিতে লেখা সেই "পুরনো কুয়ো"–র প্রসঙ্গটা মনে পড়ে তার।
রাত ১টার দিকে মির্জা বাড়ির পেছনের বাগানে গিয়ে দাঁড়ায় সে। পূর্ণিমার আলোয় কুয়োটা যেনো আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে। বাতাস থমথমে, আশপাশে কুকুরের হালকা ঘেউ ঘেউ।

হঠাৎ কুয়োর পাশে একটা ছায়া দেখতে পায় আরিফ। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায় সে।

"কে ওখানে?"
কোনো উত্তর নেই।

হঠাৎ এক চিলতে বাতাস এসে ছুঁয়ে যায় তার গা। কুয়োর পাশে একটা পুরনো কাঠের বাক্স দেখতে পায়। ধুলোমাখা, লোহার তালা পড়া। কিন্তু তালা ঝুলছে শুধু, লাগানো নেই। আরিফ কৌতুহলী হয়ে বাক্সটা খোলে।

ভেতরে একগাদা চিঠি, পুরনো সাদা জামা, একটা শিশির মধ্যে কালচে তরল—আর একটি ছবি।
ছবিটা তুলে নিতেই আরিফের শিরা-উপশিরায় ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। ছবিতে ঈশিতা দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধার পাশে। পেছনে জ্বলন্ত আগুন।

ছবির নিচে লেখা—

"শাপগ্রস্ত কন্যা ঈশিতা ও তার পালিতা মা—রহিমা বানু। মৃতদের আত্মা ভোগ করেই যার মুক্তি..."

আরিফ বুঝে যায়, ঈশিতা সাধারণ কেউ নয়। এই বাড়িতে আসার আগেই সে অন্য কোথাও এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। সিয়ামের মৃত্যু কেবল একটা শুরু।


---

পরের দিন ভোর –

আরিফ তার বাবার ঘরে গিয়ে সব কিছু খুলে বলে। ছবি, বাক্স, ডায়রির পাতা – সব কিছু সামনে তুলে ধরে।

হারুন সাহেব বিস্ময়ে স্তব্ধ। তিনিও বিশ্বাস করতে পারেন না এতদিন ধরে যার জন্য সহানুভূতি, সেই ঈশিতা এত বড় এক বিভীষিকার কারণ!

"আমার পুত্রের হত্যাকারী, সেই ছিলো!"

বাড়িতে তোলপাড় শুরু হয়। ঈশিতাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে প্রথমে সব অস্বীকার করে। কিন্তু এক পর্যায়ে ঠাণ্ডা গলায় হেসে বলে—
"তোমাদের কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই। আমার কাজ শেষ হয়নি এখনো। এবার আরিফ..."

তার চোখ রক্তবর্ণ, কণ্ঠ শীতল আর চোখে শূন্যতা।

বাড়ির সবাই পেছনে সরে আসে।

আরিফ দাঁড়িয়ে থাকে সাহস নিয়ে।
সে জানে, ভয় পেলে হারবে।
"তুমি আমার ভাইকে মেরেছো। এবার আমি তোমার মুখোশ খুলবই!"

ঈশিতা এগিয়ে আসে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ!
ঘরের বাতি ফেটে যায়, জানালা খুলে যায় আপনা-আপনি। ঘরে যেন এক অশরীরী শক্তি প্রবেশ করেছে। বাতাস ঠান্ডা, ঘন অন্ধকার।

ঈশিতা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠে মির্জা সিয়ামের মুখ!
"তুমি কথা রেখেছো না, ঈশিতা... এবার আমি তোমার মুক্তি দেবো..."
সিয়ামের কণ্ঠ যেন আকাশভেদী।

ঈশিতা কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে। হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে উঠে বলে—
"_আমার আত্মা মুক্তি চায়... মুক্তি... আমাকে মুক্তি দাও..."

এক তীব্র চিৎকারের সঙ্গে ঈশিতা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস বন্ধ।

ঘরে নেমে আসে এক অদ্ভুত নিরবতা।


---

শেষ অংশ –
মির্জা বাড়ির রহস্য আজও কেউ পুরোপুরি বোঝে না।
ঈশিতা কি সত্যিই শাপগ্রস্ত ছিল? নাকি সে এক আত্মাহীন খোলস ছিল?
আরিফ মাঝে মাঝে এখনো রাতের বৃষ্টিতে কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশিতার ছায়া দেখতে পায়।

শুধু একটাই প্রশ্ন তার মনে—
"_মুক্তি কি কখনো সম্ভব, যখন অতীত বেঁচে থাকে?"

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.